এইচ এম ওবায়দুল হকঃ ধর্ষণ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বর ও জঘন্য অপরাধ এবং সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাড়িয়েছে ৷ নরহত্যা জঘণ্য অপরাধ হলেও অনেক সময় মানুষ নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে বা অন্য কাউকে বাঁচাতে গিয়ে আত্মরক্ষার্থে তা করতে বাধ্য হন ৷ আবার অনেক সময় চোর অভাবের তাড়নায়, না খেতে পেরে চুরি করেন ৷ কিন্তু ধর্ষণ এমন একটি গুরুত্বর অপরাধ, কোন ভাবেই তার পক্ষে যুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই এবং যা ঘটা মাত্রই অপরাধ বলে গন্য, সেইসাথে ভিন্ন রং দেওয়ারও কোন অবকাশ নেই ৷

ফলে আমাদের দেশের সবচেয়ে দ্রুত বিচারের মামলাগুলোর অন্যতম হলো ধর্ষণের মামলা ৷ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মিথ্যা ও প্রতিপক্ষ কে ফাঁসানোর চেষ্টায় করা মামলা গুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ জুরে রয়েছে এই ধর্ষণ মামলা ৷

রাজু (ছদ্ম নাম) পড়াশোনার সুবাদে থাকেন ঢাকায় ৷ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারনে গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালে পারিবারিক দ্বন্দের জেরে তার প্রতিবেশী তাঁর বিরুদ্ধে, ১৫ বছরের রিমাকে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে, ধর্ষণ মামলা করেন ৷ ফলে কোন কিছু প্রমাণের আগেই অভিযুক্ত রাজুকে ধর্ষণকারী হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে সবাই চিনে যায় এবং অনেকেই ঘটনা সত্য হিসেবে ভেবেও নেয় ৷

৩ বছর কোর্টের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকে এর ফলে রাজুর পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে যায় ৷ এক পর্যায়ে রিমা আদালতে স্বিকার করে নেয়; তার বাবার প্ররোচনায় এসে প্রথমে সে স্বীকারোক্তি দেয় কিন্তু তখন সে ছোট ছিলো এবং বাবার আদেশের বাইরে কিছু বলতে পারেনি ৷ অবশেষে রাজু বেকসুর খালাস পায় ৷ কিন্তু এরইমধ্যে একটি কুঁড়ি অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায় ৷ এভাবেই হাজারো রাজু মিথ্যা মামলার বলি হয়ে জীবন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন ৷

বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯ নং ধারাতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দন্ডের বিধান করা হয়েছে ৷ যা বর্তমান সময় উপযোগী সবচেয়ে সঠিক সিন্ধান্ত ৷ একই আইনের ১৭নং ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার শাস্তির বিধান রয়েছে ৷ তাতে মিথ্যা ধর্ষণের মামলার শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছর এবং অতিরিক্ত অর্থ দন্ড প্রদান করা হয়েছে ৷ অথচ আমাদের দেশের অনেক আইনেই মিথ্যা মামলা জন্য শাস্তির বিধান হচ্ছে, যদি অপরাধটি সংঘোটিত হতো তাহলে যে শাস্তি অপরাধী পাবেন, সেই একই পরিমান শাস্তি পাবেন মিথ্যা মামলা দায়েরকৃত ব্যক্তি ৷ কিন্তু এই ধারায় তেমন উল্লেখ করা হয়নি ৷

বর্তমান ভঙ্গুর সামাজিক সম্প্রতি ও মূল্যবোধের অভাবে, বিভিন্ন পারিবারিক বা সামাজিক দ্বন্দের কারনে অনেকেই মিথ্যা মামলা করছেন ৷ ধর্ষণের শিকার একজন নারীকে যেমন সামাজিক ভাবে বিভিন্ন প্রতিপন্নতার স্বিকার হতে হয়, বিভিন্ন ভাবে হেয় হতে হয়, তদ্রুপ মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো একজন পুরুষকেও অনেক ভাবে হেয় প্রতিপন্নতার সম্মুখীন হতে হয় ৷

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে মুহুর্তেই এসব ছড়িয়ে পরে আলোর বেগে ৷ আদালতের রায়ের আগেই মানুষ তাকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেয় ৷ এর ফলে অনেকের চাকুরী চলে যায়, সামাজিক সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করেন, সামাজিক ভাবে একঘরেও হয়ে পড়েন ৷ এমনকি যেখানে বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “আটককৃত ব্যক্তি তাহার মনোনীত বা পছন্দমত আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করতে পারবেন এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না ৷”

অথচ সেখানে আমরা আদালতের রায়ের তো অপেক্ষা করিই না, বরং এর আগেই তাকে অপরাধী ঘোষণা করে দেই ৷ এবং কোন আইনজীবী তার পক্ষে কাজ করতেও চায়না কারন ঐ আইনজীবীকেও তখন সামাজিক ভাবে হেয় করা হয় ৷ এমনিকি মিথ্যা মামলায় অভিযুক্তের পরিবারকে সামাজিক ভাবে অনেক হেয় হতে হয় এবং আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় ৷ অনেক সময় আদালত বেকসুর খালাস করলেও সমাজের চোখে অপরাধীই থেকে যান তারা ৷ এর ফলে অনেক পুরুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ৷

 

 

প্রয়োজন বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং আইনের কঠোরতম শাস্তির বিধানঃ কিছুদিন আগে একটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলে, নারায়নগঞ্জে তিন ব্যক্তিকে ১৫ বছরের এর তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে কারাগারে প্রেরন করা হয় ৷ এবং তারা ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে, তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করে নেন ৷ কিন্তু যেই তরুণীকে ধর্ষণের জন্য তাদের শাস্তি হয়েছে সেই তরুণী তার প্রেমিকের সাথে সুখে সমসার করছেন ৷

 

 

আবার, এমন অনেক ধর্ষণ মামলা আছে যেগুলোর রায় দিতে ৫/১০ বছর লেগে যায় তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি এই মামলার বোঝা বয়ে বেড়ায় ৷ এমতাবস্থায়, মিথ্যা মামলার কঠোরতম শাস্তির পাশাপাশি যারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেন তাদের এ বিষয়ে আরও সঠিক নজরদারী করতে হবে ৷ শুধুমাত্র মেয়েটি ফিরে আসায় এ মামলায় খালাস পাবেন আসামীরা কিন্তু প্রেমিকের হাতে যদি মেয়েটি খুনও হতো তাহলে নির্দোষ কিছু ছেলের সাজা ভোগ করতে হতো ৷ যা তদন্তকারী সংস্থার চরম ব্যার্থতার উদাহরন হয়ে থাকবে ৷ তাই জোর পূর্বক স্বীকারোক্তি নিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও কঠোরতম শাস্তির বিধান এবং শাস্তি নিশ্চিত করা অতিব জরুরী ৷

সর্বশেষে, যদি মিথ্যা ধর্ষণ মামলা দায়ের করার জন্য শাস্তির পরিমান বাড়ানো হয় এবং আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে মিথ্যা অভিযোগ কারীকে কঠোরতম শাস্তির আওতায় নিয়ে আসেন ৷সেইসাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্তকারী কর্মকর্তা, আদালত এবং কারা কতৃপক্ষের যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে কার্যকর ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায় এবং এর সাথে জোর পূর্বক স্বীকারোক্তি নিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও কঠোরতম শাস্তির বিধান এবং শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও মিথ্যা মামলা দায়ের করার প্রবণতা কমানো যাবে বলে আশা করা যায় ৷

লেখকঃ এইচ এম ওবায়দুল হক

মন্তব্য করুণ